বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হলো ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি। দেশের প্রায় ২৯ শতাংশ অগভীর নলকূপের পানিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক পাওয়া যায়। সাধারণ ফিল্টার বা প্রচলিত পদ্ধতিতে এই ক্ষতিকর ভারী ধাতু দূর করা সম্ভব নয়। নিরাপদ খাবার পানি নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক উপায়ে আর্সেনিক পরীক্ষা এবং সঠিক প্রযুক্তির ফিল্টার নির্বাচন করা জরুরি।
সারসংক্ষেপ
- বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের সরকারি গ্রহণযোগ্য মাত্রা ০.০৫ মিলিগ্রাম/লিটার হলেও WHO-এর মানদণ্ড অনুযায়ী এটি ০.০১ মিলিগ্রাম/লিটার হওয়া উচিত।
- সাধারণ অ্যাক্টিভেটেড কার্বন বা ইউভি (UV) ফিল্টার পানি থেকে আর্সেনিক ও ভারী ধাতু দূর করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
- রিভার্স অসমোসিস (RO) মেমব্রেন এবং বিশেষায়িত আর্সেনিক রিমুভাল ফিল্টারই পানি নিরাপদ করার একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত সমাধান।
ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণের বর্তমান চিত্র ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নিরাপদ খাবার পানিতে আর্সেনিকের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে প্রতি লিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম বা ০.০১ মিলিগ্রাম। বাংলাদেশ সরকারের মানদণ্ড অনুযায়ী এই সীমা প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রাম বা ০.০5 মিলিগ্রাম। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে প্রায় ৬১টি জেলার ভূগর্ভস্থ পানিতেই আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে চাঁদপুর, মুন্সীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ এবং নোয়াখালী অঞ্চলে এই দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
দীর্ঘদিন ধরে আর্সেনিকযুক্ত পানি পানের ফলে মানবদেহে মেলানোসিস, কেরাটোসিস এবং গ্যাংগ্রিনের মতো মারাত্মক চর্মরোগ দেখা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, শরীরে আর্সেনিক জমতে থাকলে তা লিভার, কিডনি এবং ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও কয়েকগুণ বেশি। অথচ অনেকেই না জেনে সাধারণ ফিল্টারের ওপর ভরসা করে এই বিষাক্ত পানি পান করে চলেছেন।
আর্সেনিক একটি অদৃশ্য ও স্বাদহীন বিষ যা ফুটানো হলেও পানি থেকে দূর হয় না।
আর্সেনিক ও ভারী ধাতু দূরীকরণে বিভিন্ন ফিল্টারিং প্রযুক্তির কার্যকারিতা
বাজারের সাধারণ ফিল্টারগুলো কেবল পানিতে থাকা ধূলিকণা, বালু এবং কিছু ব্যাকটেরিয়া দূর করতে পারে। ভারী ধাতু ও আর্সেনিক দূর করতে প্রয়োজন উন্নত মেমব্রেন প্রযুক্তি। নিচে বিভিন্ন ফিল্টারিং প্রযুক্তির কার্যকারিতা তুলনা করে দেখানো হলো:
| ফিল্টারিং প্রযুক্তি | আর্সেনিক দূরীকরণের হার | অন্যান্য ভারী ধাতু (সীসা, ক্যাডমিয়াম) | উপযুক্ততা |
|---|---|---|---|
| সাধারণ অ্যাক্টিভেটেড কার্বন | ০% – ৫% (অকার্যকর) | খুবই সামান্য | শুধুমাত্র গন্ধ ও ক্লোরিন দূর করতে |
| আল্ট্রাফিল্ট্রেশন (UF) | ১০% – ২০% | আংশিক | মাঝারি মানের ব্যাকটেরিয়া মুক্ত পানি |
| রিভার্স অসমোসিস (RO) | ৯৫% – ৯৯% (সর্বোত্তম) | ৯৯% পর্যন্ত দূর করে | উচ্চ মাত্রার আর্সেনিক ও লবণাক্ত পানি |
| বিশেষায়িত আয়রন ও আর্সেনিক রিমুভার (IAR) | ৮৫% – ৯৫% | মাঝারি | আয়রণ ও আর্সেনিক প্রধান অঞ্চল |
একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার একটি নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা পাওয়া গিয়েছিল ০.১৮ মিলিগ্রাম/লিটার, যা সরকারি সীমার চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি। সেখানে একটি সাধারণ ইউভি আল্ট্রাফিল্টার বসানোর পরও পানির গুণগত মানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরবর্তীতে একটি উন্নত আরও (RO) ওয়াটার পিউরিফায়ার স্থাপনের পর সেই পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা ০.০০৫ মিলিগ্রাম/লিটারে নেমে আসে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের চেয়েও অনেক নিরাপদ।
সঠিক ফিল্টার নির্বাচন করার চেকলিস্ট ও সার্টিফিকেশনের গুরুত্ব
একটি ওয়াটার পিউরিফায়ার কেনার আগে কেবল ব্র্যান্ড বা বাহ্যিক ডিজাইন না দেখে তার ভেতরের ফিল্টার কার্টিজ এবং সার্টিফিকেশন যাচাই করা আবশ্যক। আর্সেনিক ও ভারী ধাতু দূরীকরণের জন্য ফিল্টারে আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি থাকা জরুরি।
- RO মেমব্রেন যাচাই: ফিল্টারে ব্যবহৃত রিভার্স অসমোসিস মেমব্রেনের পোর সাইজ বা ছিদ্রের ব্যাস ০.০০০১ মাইক্রন হতে হবে। এই সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে আর্সেনিক অণু প্রবেশ করতে পারে না।
- NSF সার্টিফিকেশন: ফিল্টার কার্টিজগুলো আন্তর্জাতিক NSF/ANSI ৫৮ (রিভার্স অসমোসিস সিস্টেমের জন্য) অথবা NSF ৫৩ (স্বাস্থ্য ঝুঁকি হ্রাসকারী ফিল্টারের জন্য) সার্টিফাইড কিনা তা নিশ্চিত হোন।
- নিরাপত্তা সার্টিফিকেশন: সম্পূর্ণ ওয়াটার পিউরিফায়ার ইউনিটটি CE, UL, FCC এবং ROHS সার্টিফাইড হওয়া উচিত, যা ডিভাইসের বৈদ্যুতিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ONEMI-এর সম্পূর্ণ ওয়াটার পিউরিফায়ার ইউনিটগুলো এই সমস্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে মেনে তৈরি করা হয়।
- পানির অপচয় ও রিজেক্ট রেশিও: মনে রাখবেন, যেকোনো RO ফিল্টার পানি পরিশোধন করার সময় কিছু পানি ড্রেন লাইন দিয়ে বের করে দেয়। ভালো মানের ফিল্টারে এই পানির অপচয় তুলনামূলক কম হয়।
অনেকেই মনে করেন RO ফিল্টার ব্যবহারের ফলে পানি থেকে প্রয়োজনীয় সব খনিজ উপাদান দূর হয়ে যায়। এটি একটি বড় ভুল ধারণা। আধুনিক মাল্টি-স্টেজ ফিল্টারগুলোতে রি-মিনারেলিজেশন কার্টিজ থাকে, যা পানিকে নিরাপদ করার পর তাতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানগুলো সঠিক মাত্রায় পুনরায় যোগ করে। তাই ফিল্টার কেনার সময় অবশ্যই টিডিএস (TDS) কন্ট্রোলার এবং মিনারেল কার্টিজ সমৃদ্ধ মডেল বেছে নেওয়া উচিত।
আর্সেনিক টেস্ট ও ফিল্টার রক্ষণাবেক্ষণ নির্দেশিকা
আপনার এলাকার পানিতে আর্সেনিক আছে কিনা তা খালি চোখে বা স্বাদ দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই। ফিল্টার কেনার আগে এবং কেনার পর নিয়মিত ব্যবধানে পানি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
১. প্রথমত, স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE) বা কোনো বিশ্বস্ত ল্যাবরেটরি থেকে আপনার নলকূপের পানির কেমিক্যাল টেস্ট করিয়ে নিন। বিশেষ করে আর্সেনিক, আয়রন এবং টিডিএস (TDS) পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
২. দ্বিতীয়ত, ফিল্টার কেনার পর প্রতি ৬ থেকে ১২ মাস পর পর পিপি (PP) এবং কার্বন ফিল্টার পরিবর্তন করুন। RO মেমব্রেন সাধারণত পানির মানের ওপর নির্ভর করে ১.৫ থেকে ২ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে। ONEMI ব্র্যান্ডের পিউরিফায়ারগুলোতে স্বয়ংক্রিয় ফিল্টার লাইফ ইন্ডিকেটর থাকে, যা ফিল্টার পরিবর্তনের সঠিক সময় মনে করিয়ে দেয়।
৩. তৃতীয়ত, দীর্ঘ সময় ফিল্টার অব্যবহৃত থাকলে পুনরায় ব্যবহারের আগে অন্তত ১০-১৫ লিটার পানি ড্রেন আউট করে ফেলে দিন। এটি মেমব্রেনের ভেতরে জমে থাকা ব্যাকটেরিয়া বা ক্ষতিকর উপাদান পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করলে দামি ফিল্টারও একসময় আর্সেনিক দূর করতে ব্যর্থ হতে পারে।